সম্প্রতি ফেসবুক, ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে গেলেই একটি খবর খুব চোখে পড়ছে— “পৃথিবী থেকে নাকি পুরুষ জাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে!” খবরটা শুনে অনেকেই বেশ ভয় পেয়ে গেছেন, আবার অনেকেই মিম বানিয়ে মজা করছেন। চারদিকে এই নিয়ে রীতিমতো আতঙ্ক আর জল্পনা-কল্পনা চলছে।
প্রশ্ন হলো, ওয়াই ক্রোমোজোম (Y Chromosome) কি সত্যি সত্যি উধাও হয়ে যাচ্ছে? বিজ্ঞান আসলে কী বলছে? আসুন, আজ কোনো রকম জটিল বৈজ্ঞানিক টার্মে না গিয়ে, একেবারে সহজ আর আটপৌরে ভাষায় পুরো ব্যাপারটা একটু বুঝে নিই।
ওয়াই ক্রোমোজোমের ক্ষয়: খবরটা কি আসলেই সত্যি?
শুনতে অবাক লাগলেও, ভাইরাল হওয়া এই খবরের একটা বড় অংশ কিন্তু একদম সত্যি! বিজ্ঞানীরা বিস্তর গবেষণা করে দেখেছেন যে, গত ১৮ কোটি বছরের বিবর্তনের ইতিহাসে ওয়াই ক্রোমোজোম তার শুরুর দিকের প্রায় ৯৭ শতাংশ জিনই (Gene) ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলেছে।
একটু সহজ করে তুলনা করলে ব্যাপারটা আপনার কাছে একদম পরিষ্কার হবে:
- এক্স (X) ক্রোমোজোম: বর্তমানে মেয়েদের শরীরে থাকা এক্স ক্রোমোজোমে প্রায় ৯০০ থেকে ১৪০০টির মতো জিন বেশ শক্তপোক্তভাবে টিকে আছে।
- ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম: অন্যদিকে, পুরুষদের ওয়াই ক্রোমোজোমের অবস্থা বেশ করুণ! এতে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৪৫টির মতো জিন।
বিখ্যাত জিনতত্ত্ববিদদের মতে, ওয়াই ক্রোমোজোমের এই ক্ষয়ে যাওয়ার হার যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে আগামী ৬০ থেকে ৭০ লাখ বছরের মধ্যে মানুষের শরীর থেকে ওয়াই ক্রোমোজোম পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
ওয়াই ক্রোমোজোম না থাকলে কি পুরুষরা হারিয়ে যাবে?
এই প্রশ্নটাই এখন সবার মাথায় ঘুরছে। তবে স্বস্তির কথা হলো— একেবারেই না! এই কথা শুনে অযথা ভয় পাওয়ার বা প্যানিক করার কিচ্ছু নেই। ওয়াই ক্রোমোজোম না থাকার মানেই এই নয় যে পুরুষ জাতি পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেবে।
এর সবচেয়ে বড় এবং জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ হলো জাপানের ‘আমামি স্পাইনি র্যাট’ (Amami Spiny Rat) নামের এক বিশেষ প্রজাতির ইঁদুর। শুনলে চমকে যাবেন, এই ইঁদুরগুলোর শরীরে ওয়াই ক্রোমোজোম বা পুরুষত্ব নির্ধারণ করার মতো কোনো জিনই অবশিষ্ট নেই!
তা সত্ত্বেও এরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়নি। বরং এরা দিব্যি পুরুষ ও স্ত্রী ইঁদুর জন্ম দিচ্ছে এবং দারুণভাবে বংশবৃদ্ধি করে চলেছে। বিজ্ঞানীরা যখন এই ইঁদুরগুলোকে নিয়ে গবেষণা করলেন, তখন এক অবাক করা তথ্য সামনে এলো। তারা দেখলেন, ওয়াই ক্রোমোজোম হারিয়ে গেলেও প্রকৃতির নিয়মে এদের শরীরে থাকা অন্য একটি সাধারণ ক্রোমোজোমের জিন (যাকে বিজ্ঞানীরা SOX9 বলছেন) সামান্য বদলে গেছে। আর এই বদলে যাওয়া জিনটাই এখন নতুন করে “পুরুষ হওয়ার সুইচ” হিসেবে কাজ শুরু করেছে!
ভবিষ্যতে মানুষের কী হবে?
মানুষের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক জাপানি ইঁদুরগুলোর মতোই হবে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। বিবর্তন বা ইভোলিউশন খুব অদ্ভুত একটা জিনিস। ভবিষ্যতে যদি আমাদের ওয়াই ক্রোমোজোম পুরোপুরি হারিয়েও যায়, বিবর্তনের নিজস্ব নিয়মে শরীরের অন্য কোনো জিন ঠিকই সেই দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নেবে। প্রকৃতি কখনোই শূন্যস্থান পছন্দ করে না, সে তার বিকল্প ঠিকই তৈরি করে নেয়।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, ওয়াই ক্রোমোজোম পুরোপুরি বিলুপ্ত হতে এখনো প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ বছর বাকি! মানব সভ্যতার বয়সের তুলনায় এই সময়টা এতই বিশাল যে, এটা নিয়ে আজ বসে চিন্তা করার কোনো মানেই হয় না।
তাই অদূর ভবিষ্যতে পুরুষ বিলুপ্ত হওয়ার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার হেডলাইন দেখে অযথাই আতঙ্কিত হবেন না। প্রকৃতি তার নিজের পথ ঠিকই খুঁজে নেবে, আর পুরুষরাও পৃথিবীর বুকেই স্বমহিমায় টিকে থাকবে।